দুই মানচিত্রে তুমি আর আমি
সন্ধ্যার দিকে বাড়ির মেইন গেট খুলে ভিতরে পা বাড়াতেই, আমার পা যেন কোনো উঁচু কিছুর উপর পড়লো। আমি সাথে সাথেই পা 'টা সরিয়ে নিলাম। দরজা একটু সরিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখি দিয়া দাঁড়িয়ে আছে। দিয়া আমার দিকে না তাকিয়ে একটু সরে, ওর ঘাড় কাঁত করে আমার পিছনের দিকে তাকালো। কয়েক সেকেন্ড তাকানো শেষে আমাকে বলে "চাচা তোকে এত বারণ করে, তবুও লুবানার সাথে কেনো মিশিশ? জানিস না মেয়েটা কত খারাপ।" আমি দিয়ার দিকে তাকালাম। দিয়ার কোনো কাজ নেই, সারাদিন আমাদের বাড়িতে এসে বসে থাকবে। আমাকে শাষন করার এক বিশাল আগ্রহ দিয়ার মাঝে পরিলক্ষিত হয় সেটা বাড়ির সবাই জানে। আমি দিয়ার কথার কোনো উত্তর দিলাম না। পিছনে ঘুরে তাকালাম। লুবানা এখনো গলি বরাবর হেঁটে যাচ্ছে। সামনেই একটি বাঁক। বাঁক পার হলে লুবানাকে আর দেখা যাবে না। বাঁকের কাঁছাকাছি এসে লুবানা থেমে দাঁড়ালো। আমার দিকে ঘুরে, একটু মুচকি হেসে, হাঁত উঁচু করে বিদায় জানিয়ে, ওখান থেকে চলে যায়।
আমি সামনে ঘুরলাম। আমার সামনে তখনো দিয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম "এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? কিছু বলবি?" দিয়া একটু কড়া দৃষ্টিতে তাকালো। সুন্দরী মেয়েদের রাগি দৃষ্টিটাও যে বেশ মোহনীয় সৃষ্টি করে, তা বেশ বুঝতে পারছি। দিয়া কড়া গলায় বললো "তোর লুবানার সাথে এত কিসের মেলামেশা? মেয়েটা ভালো না। আমার বান্ধবিগুলো তোকে আর লুবানাকে নিয়ে অনেক কিছু বলে। এলাকার মানুষও তোকে নিয়ে কথা বলে। এগুলো শুনতে ভালো লাগে না।" আমি দিয়ার কথায় হাসলাম। ওর এমন অহেতুক ভালো না লাগার কারন খোজার চেষ্টা করলাম। আমি আপাতত ব্যর্থ। "কথা বলছিস না কেনো?" আমি দিয়ার প্রশ্ন শুনে হেসে দিয়ে বললাম "এলাকার মানুষের বেশি খারাপ লাগে, নাকি তোর বেশি লাগে?" দিয়া আমার দিকে সরল দৃষ্টিতে তাকালো।
"সর সামনে থেকে। লুবানা অনেক ভালো মেয়ে।"
"তুই সবসময় ওর সাথে কেনো থাকিস?" (দিয়া)
"আমার ভালো লাগে। কারন মেয়েটা সবার থেকে আলাদা।"
দিয়া আর কিছু বললো না। সে পাশ কেঁটে চলে যায়। আমি বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করি। সোজা হেঁটে কলপাঁড়ে যায়। সন্ধ্যায় কলপাড় থেকে ওযু করে নিলাম। নামাজ পড়ার প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করি। আব্বা নামাজের জন্য বের হচ্ছেন। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি থেমে যায়। আমাকে শুনিয়ে আম্মাকে জোরে জোরে বলতে লাগলেন "আবিরের মা তোমার ছেলেকে বলে দিও, ঢাকা থেকে যেন আর না আসে বাড়ি। এখানে আসলে সে নষ্ট হয়ে যাবে। শুনছো তো বাসার বাড়ির ভাবি কি বলে গিয়েছিল।" আমি আব্বার কথার কোনো জবাব দিলাম না। টুপি নিয়ে নামাজের উদ্দেশ্যে বের হলাম।
.
রফিক ভাই আর ভাবির মধ্যে প্রায়শই ঝগড়া হতে দেখা যায়। ঝগড়ার কারন মাজেদা চাচিকে নিয়ে। আইরিন ভাবি শ্বাশুড়ি মাজেদা চাচিকে নিয়ে রফিক ভাইয়ের সাথে থাকতে চাননা। ভাবির দাবী হল, শ্বাশুড়িকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে হবে। রফিক ভাইও এমন, মানে ভাবির সাথে একমত। গত দুইদিন আগে মাজেদা চাচিকে আইরিন ভাবি গালে চড় দিয়েছিলো। মাজেদা চাচি কাঁদতে পারেন না তেমন জোরে। তবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বেশ কাঁদছিলেন তিনি, তার গোঙানির শব্দ শুনে বুঝে গিয়েছিলাম।
আইরিন ভাবী মাজেদা চাচিকে বেশ কষ্টদায়ক কথা বলেন। রফিক ভাই বাড়িতে এলে, মাজেদা খালা যদি রফিক ভাইকে বলে 'বাপ, তোর বউ আমার লগে বড় বড় কথা বলে, আমাকে গালি দেয়। তুই কিছু বলিস না কেনো?' রফিক ভাই আইরিন ভাবিকে কিছু না বলে বরং মাজেদা খালাকেই বলে "মা তুমি, কেনো আইরিনের সাথে লাগতে আসো। এত সমস্যা কেনো আইরিনকে নিয়ে? সহ্য হয়না। বাড়ি থেকে চলে যাও না হয় আমরা চলে যাই।" মাজেদা খালা কিছু বলতো না আর। আইরিন ভাবি তখন সুযোগ পেয়ে রফিক ভাইকে বলতো "দেখো দেখো, তোমার মা কত বড় বেয়াদব মহিলা। ছেলের কাছে বৌমাকে নিয়ে বিচার দিচ্ছে। এমন বাড়িতে থাকবো না। জানো না তো তোমার মা কি কি বলে আমাকে। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাই তোমার মা।" রফিক ভাই এসব শুনে, মাজেদা চাচির সাথে তখন ঝগড়া করতো। যদিও মাজেদা চাচী তার ছেলের কথা শুনে চুপচাপ থাকতেন। রফিক ভাই বৌয়ের সাথে থেকে মাজেদা চাচিকে গালি গালাজ করতো।
নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হলাম। গ্রামের হাজী মেম্বার সাহেব আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন "শোনো আবির, তোমাকে সবাই ভালো ছেলো হিসেবে জানে। এলাকায় তোমার বাবার আর তোমার ভালো দিক ছাড়া মানুষ কোনো কথা বলে না। তোমার একটা সম্মান আছে। সেই সম্মানটা তুমি নিজে নষ্ট করছো। লুবানার লগে তোমার এত কিসের মেলামেশা হুম? মাইয়াডা ভালো না, এইডা এলাকার মানুষ সগ্গুলে জানে। তুমি কি জানো না নাকি?" আমি হাজি মেম্বারের দিকে তাকালাম। লোকটা আমার দিকে রাগি চোখেই তাকিয়ে আছে। আমি বললাম "আমার ভালো লাগে লুবানার সাথে থাকতে। আমার চোখে পড়েনি, সে খারাপ। আর বড় কথা সে আমার সুপরিচিত। তার বা আমার তো কোনো সমস্যা নেই, তাহলে আপনাদের কেনো এত কিছু খেয়াল রাখতে হবে?" হাজী মেম্বার হেসে বলে "এলাকায় ভালো খারাপ সব তো আমাকে দেখে রাখতে হয় বাজান। তয় কাজটা কিন্তু ঠিক করতিছো না, লুবানা তুমার লাইগা আমাগো লগে বড় করে কথা কয়বার সাহস পায়তাছে। ঠিক ভাবে থাইকো।"
হাজী মেম্বার চলে গেলো আমার সামনে থেকে। আমি এগিয়ে আসতে থাকি। পকেটে থাকা ফোনটা বেজে ওঠে। তাকিয়ে দেখি দিয়ার কল এসেছে। কেঁটে দিলাম। সাথে সাথেই মেজেজ "তুই ঢাকা থেকে এসে খালি বাহিরে বাহিরে থাকিস কেনো? বাড়িতে আয়।" আমি রিপ্লে করিনি। আমি হাঁটতে থাকি। মুহিদ চাচা আমার পাশে এসে হাঁটতে লাগলেন। চাচা রিকশা চালক। আমারে এসে বলে..
"কি ব্যাপার আবির বাবা চুপচাপ কেনো? হাজী মেম্বার কি কইছে। লোকডা ভালা না। শুনলাম লুবানারে নিয়া কথা কইতেছিল। হারামিডা লুবানারে রাতে বিছানায় ডাকছিল, লুবানা যায়নাই দেইখা তোমার লগে এগুলো কইয়া গেছে। তুমি আছো দেইখা লুবানারে এখন কেউ কিছু কইতে পার না। থাকো বাবা চইলা যায়। কাম আছে।"
আমি চুপচাপ ওনার কথাগুলো শুনলাম। হাজী মেম্বার এলাকার মেম্বার। দুই নাম্বারি করে পাস করেছে। ক্ষমতা পেয়ে নিজেকে বেশ ক্ষমতাধর মনে করেন তিনি। লুবানা সেদিন বলেছিল হাজী মেম্বারের কথা। লোকটার বউ নেই। লুবানাকে তার চায়। লুবানা সেটা না করতেই, আজকে আমার কাছে এসে কথাগুলো বলে গিয়েছে। হাঁটার গতি বাড়ালাম। রফিক ভাইয়ের বাড়ির সামনে আসতেই, বাড়ির ভিতর থেকে মাজেদা খালার ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ কানে ভেসে উঠল। আইরিন ভাবি চিৎকার করে তার শ্বাশুড়িকে বলতে লাগলেন "মাগী মহিলা.. আমার মায়ের কাছে তোর পড়ে থাকা উচিৎ। তোর ভাগ্যের ব্যাপার আমার মত একটা বউমা পাইছিস। মরতে পারিস না। নস্যার মহিলা.. তোর ছেলে আজ আসুক, আজকে তোকে ধরে দু ঘা দেবো।" মাজেদা খালা প্রতিত্তরে বলে "বৌমা তোমারে আমি কি বলেছি? কেনো এমন করে বলছো? শুধু বলেছি, তরকারীটা গরম করে রাখতে। এতেই তুমি সাত বন্না শুরু করেছো।"
আমি সেখান থেকে দ্রুত চলে আসি। একদিন রফিক ভাইয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম ঝগড়া চলাকালীন সময়ে। কিন্তু তিনি আমাকে অনেক কথা শুনিয়েছিল। তাই আত্বসম্মান বোধে আর কখনো ওনার বাসায় যায়নি। বাড়িটা পাশে হওয়াতে প্রতিনিয়ত ঝগড়া শুনি সেখান থেকে। তবে কিছু বলার নেই। যার যার বাড়ির ব্যাপার। কিছু বলতে গেলে, অধিকারের দাম দিতে হবে, সুত্র দেখাতে হবে কেনো এসেছি এখানে। তাই চুপচাপ থাকতে হয়।
.
সোফাতে এসে বসলাম। আম্মাকে একটা চা দিতে বলেছি। চা হাতে নিয়ে দিয়া এসে সামনে দাঁড়ালো। দিয়ার হাত থেকে চা নিয়ে চুমুক দিলাম। মেয়েটা ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম..
"দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?"
"চা কেমন হয়েছে সেটা বল।"
"ভালো।"
"শুধু ভালো? তুই এমন গ্রীষ্মের দুপুরের মত শুকনো করে কথা বলিস কেনো আমার সাথে? লুবানার সাথে তো খুব হেসে হেসে কথা বলিস। আমার বেলাতে কি হয় তোর?"
"তুই এখনো আমাদের বাড়িতে কি করিস? যা বাসায় যা।"
"তোর একার বাসা নাকি? আমার চাচার বাসা, তুই যা এখান থেকে।"
দিয়া কথাটা বলে আমার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে হনহন করে ভিতরে চলে যায়। আমি বোকার মত ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। মেয়েটা বেশ জেদি। তার অধিকারসুলভ আচরণ আমাকে তাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। কখনো কখনো দিয়াকে নিয়ে কারন ছাড়াই ভাবতে থাকি, ওর হাত ধরে হাঁটছি চেনা পথে। মেয়েটা মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে মুখটা ওড়নার সাথে ঢেকে আমার হাত ধরে হাঁটে। তাকে নিয়ে এমন কল্পনা করার কোনো মানে আমি খুজে পাইনা। কিন্তু ভালো লাগাটা বেশ কাজ করে।
সম্পর্কে সে দূরসম্পর্কের চাচার মেয়ে হলেও। মা বাবা তাকে খুব ভালোবাসেন। যখন ঢাকা থেকে বাড়িতে আসি, তাকে দেখি সবসময় আমাদের বাড়িতে থাকতে। আম্মা আমার সামনে শুনিয়ে শুনিয়ে দিয়াকে বলে "কি ব্যাপার দিয়া, এমনিতে তো সারাদিন আমাদের বাড়িতে থাকিস না। যেদিন শুনিস আবির আসবে, সেদিনের দুদিন আগে থেকে আমাদের বাড়িতে এসে থাকা শুরু করিস। ব্যাপার কি হুম?" দিয়া কিছু বলে না, সে কেবল মুচকি হাসে। আম্মা আমাকে ডেকে বলে "জানিস দিয়া তোর রুম গুছিয়ে রাখে। তোর কি কি খাবার পছন্দ, তা তোর আব্বাকে বলে বাজার থেকে এনে রান্না করে রাখবে। যেন তুই ঢাকা থেকে এসেই মজা করে খেতে পারিস। মেয়েটা তোকে কত খেয়াল রাখে।"
আমার কথায় আমিও বেশ লজ্জা পায়। ছেলেদের লজ্জা পাওয়ার ব্যাপারগুলো বেশ আলাদা হয়ে থাকে। ছেলেটা হুটহাট লজ্জা পায়না। তবে মেয়েদের সামনে গেলে বেশি পরিমানে লজ্জাবোধ হয় তাদের। সব ছেলে আবার আমার মত লজ্জাশীল নাও থাকতে পারে। আমি রুমে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। আব্বা আসলেন। আমাকে ডেকে বললেন "দাঁড়াও, তোমার সাথে কথা আছে।" আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। আব্বা এসে সামনের সোফাতে বসলেন। আম্মা, দিয়া আব্বার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমার দিকে গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে বললেন "আমার মান সম্মানটা কি তুমি রাখবে না হুম?" আমি কোনো জবাব দিলাম না। আমার হয়ে আম্মা বললেন "থাকুক না ওর মত? শহরে কি না কি করে.. এখানে এসে একটু ঘোরে, তেমন তো কারো সাথে মেশে না। বকাঝকা কেনো করছো?" আব্বা আরো রেগে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন..
"চুপ করে আছো কেনো? বলো.. আমার মান সম্মানটা কি তুমি রাখবে না?"
"কি করেছি?"
"প্রশ্ন করছো? বেয়াদব ছেলে। তোমার জন্য কত মানুষ আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে লুবানাকে নিয়ে কথা বলে। লুবানাকে আমি ঘরের বউ করতে পারবো না। লোকেরা এসবই বলে। আমি কানে নিইনা। কিন্তু কতক্ষণ সহ্য করবো? এলাকার মানুষ কিন্তু তোমাকে নিয়ে লুবানার সাথে জড়িয়ে নানান কথা বলে।"
"কেনো বলে? লুবানা কি এমন করেছে? আমার সাথে তো সে কখনো খারাপ কিছু করেনি? কে বলে লুবানা খারাপ? আপনারা কেনো বারবার লুবানাকে নিয়ে কথা তোলেন? একটা মেয়ে সারাদিন একা থাকে। সে খেয়েছে কিনা, এটা কেউ তো খোজ নেয়না। শুধু তার খারাপ নিয়ে কথা বলে। এমন কেনো আমরা?"
"তুই চাচার সাথে এভাবে কথা বলছিস কেনো?" (দিয়া)
*চুপ কর তুই। আমার যার সাথে ভালো লাগে ঘুরবো। কারন আমি জানি কে খারাপ, কে ভালো। বুঝতে শিখেছি আমি। আর আপনাদের কিসে সম্মান নষ্ট হবে, বাড়বে সবকিছু আমি জানি। আমার তো কোনো সমস্যা হয়না। তাহলে মানুষের কেনো এত মাথা ব্যাথা হয়?"
আমি ওনাদের সামনে থেকে চলে আসি। আব্বার দিকে তাকালাম না। কথাগুলো জোরে বলিনি। স্বাভাবিক ভাবেই বলেছি। রুমে এসে বসি আমি। ভালো লাগছে না কিছু। বিছানায় বসে গা এলিয়ে দিলাম। ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠলো। স্ক্রীনে তাকালাম। লুবানার নাম্বার। আমি তাড়াতাড়ি রিসিভ করলাম। সে বলে..
"আবির, হাজীর লোকেরা আমার আসছিল। আমাকে তুলে নিয়ে যেতে চাই। আমাকে একটুও শান্তিতে থাকতে দেয়না। ওরা কেনো এমন করে?"
"চিন্তা করিও না। সব ঠিক হয়ে যাবে। কালকে সকালে আসবোনি।"
"তুমি এসো না। মানুষজন আমার আর তোমাকে নিয়ে অনেক কথা বলে।"
"তুমি তো বুঝিয়েছো, মানুষের কথা কানে নিতে নেই। তাহলে এখন এগুলো বলছো কেনো?"
"আবির, তুমি ভালো ছেলে, চাইনা আমার মত খারাপ ছেলের সাথে তুমি মেশো। তোমার খারাপ হোক এটা তো চাইনা।" (লুবানা)
"রাখছি, রাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়িও।"
ফোন কেঁটে দিলাম। লুবানা মেয়েটা তার ছোট ভাইকে নিয়ে একা থাকে। ওর মা বাবা মরে গেছে অনেক আগে। বুঝিনা মানুষেরা কেনো এতকিছু বলে ওকে নিয়ে। সমাজের এক শ্রেনীর মানুষ কিছু না জেনে কথা রটায়, আবার অন্যদের নিয়ে চর্চা করতে ভালোবাসে।
.
সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। দিয়া এসে দরজার সামনে দাঁড়ায়। আমি দিয়ার দিকে তাকালাম। ওর ড্রেসআপ আজকে অন্যরকম লাগছে। শাঁড়ি পরেছে। কিন্তু পেট খেলা রাখা, হাত কাঁটা ব্লাউজ। আমি কপাল কুঁচকে দিয়ার দিকে তাকাতে সে বললো.. "আবির, ভালো করে দেখে বলতো, আমাকে কেমন লাগছে? হট নাকি সেক্সি?" আমি দিয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। একটা ঝাড়ি দিয়ে বললাম..
"এগুলো কেমন করে পরেছিস? যা চেন্জ কর।"
"কেনো করবো? লুবানাও তো এমন করে শাঁড়ি পরে। তুই যদি ওর সাথে থাকতে পারিস, আমিও তো এভাবে পরেছি। তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছিস না কেনো?"
দিয়ার কথার কোনো উত্তর দিলাম না। পাশ কেঁটে চলে আসছি। সে আমার হাত টেনে ধরলো। আমি তাকাতেই, হাত ছেঁড়ে দেয়। সে মাথা নিচু করে বলে "আমাকে নিয়ে একটু ঘুরতে যাবি? ঢাকা থেকে এসে সবসময় বাহিরে বাহিরে থাকিস। কেনো এমন করিস?" দিয়ার কথা শুনে বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়েটার কথায় আক্ষেপনা বেশি। আমি নরম গলায় বললাম "রেডি থাকিস বিকালে নিয়ে যাবো। এখন লুবানার কাছে যেতে হবে।" দিয়ার থেকে কিছু না শুনে চলে আসলাম। হয়ত মেয়েটা আমার দিকে করুন দৃষ্টিতে নয়ত রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে।
.
লুবানাকে নিয়ে রিকশাতে উঠলাম। মেয়েটা আমার দিকে তাকাচ্ছে না। সে মন খারাপ করে বসে আছে। আমি ওর হাত ধরলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে..
"দিয়া তোমাকে অনেক ভালোবাসে তাইনা?"
"জানিনা।"
"কেনো জানোনা আবির?"
"তুমি আমাকে ভালোবাসো?" (আমি)
"হিহিহি... আবির.. হাজী মেম্বার এসে বলেছিল এক রাতের জন্য আমাকে দশ হাজার টাকা দেবে। লাবিবের পড়াশোনার খরচ অনেকদিন অবদি চলবে কি বলো?"
আমি লুবানার হাত ছেঁড়ে দিলাম। রিকশা মামাকে কড়া গলায় বললাম "মামা, রাখো নামবো।" রিকশা থেকে নামলাম। রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটছি। লুবানা আমার পিছনে হাঁটছে। লুবানা আমার বন্ধু। ছোট বেলায় প্রায়মারীতে একসাথে ফাইভ অবদি পড়েছিলাম। যখন ফাইভে সমপনী পরিক্ষায় বৃত্তি পাই, আব্বা ঢাকার স্কুৃলে ভর্তি করিয়ে দেয়। মামা বাড়িতে থাকা শুরু করি ঢাকাতে। বছরে ঈদে শুধু বাসায় আসতাম। কিন্তু তখন পড়াশোনা ছাড়া যেন কিছুই বুঝতাম না। বাড়িতে এসেও বই নিয়ে বসে থাকতাম। মাস্টার্স শেষ করে একটা জব নিয়ে ঢাকাতে বেশ ব্যস্ত সময় পার করি আমি।
এর মধ্যে একদিন বাড়িতে আসার সময় রাত হয়ে যায়। বাস স্ট্যান্ড থেকে রাত এগারোটার সময় রিকশা পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। বাজার থেকে বাড়িতে আসার পথ বিশ মিনিটের মত। আমি হাঁটা শুরু করি। এলাকার রাস্তায় এসে হাঁটার গতি বাড়াতেই, পিছন থেকে শুনতে পাই.. "এই তুমি না আবির? আদনান চাচার ছেলে?" আমি চমকে উঠি। এত রাতে মেয়ের কণ্ঠ। আমি পিছনে ঘুরে তাকায়। একটা লম্বা গড়নের শাঁড়ি পরা মেয়ে দাঁড়ানো। মুখটা চেনা চেনা মনে হলেও, তখন যেন চিনতে পারিনি। ফোনের টর্চ একটু উঁচু করতেই সে আমার কাছে এগিয়ে আসে। আমার পাশে এসে বলে.. "যাক, এতটা রাস্তা, একা যেতে হবে না। একজন সঙ্গী পেলাম। তা তুমি এত রাতে ফিরছো কেনো? তুমি তো কখনো রাতে বাইরে দেখিনি। আজ প্রথম দেখলাম। যদিও তোমাকে আমি আগে আরো বেশ কয়েকবার দেখেছি। বন্ধুদের সাথে বিকালে রাস্তার পাশের মাঠে বসে, গিটার নিয়ে গান গাইতে। বেশ ভালো গাও তো তুমি? ছোট বেলায় এমন গুন ছিল বুঝতেই পারিনি। ঢাকাতে কি গান টান গাও নাকি?"
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামে মেয়েটা। আমি তখনো মস্তিষ্কে চাপ দিয়ে যাচ্ছি কে হবে মেয়েটা এটা ভেবে। কিন্তু আমি যেন ব্যর্থ। মেয়েটাকে চেনার চেষ্টা করি। কিন্তু আমার ভুলো মন মেয়োটাকে অচেনা করে রাখে। মেয়েটা হাসতে হাসতে বলে..
"তুমি কম কথা বলো? ভালো তো.. নাকি আমাবে চিনতেই পারোনি। হায় আল্লাহ.. এই ছেলে সত্যিই আমাকে চেনেনি। আবির.. আমি লুবানা। মনে আছে আমাকে ক্লাসের প্রায় সবাই লবণ বলে ডাকতো, তুমি ওদেরকে একদিন অনেক বকা দিয়েছিলে।"
"ওহ তুমি.. কেমন আছো?"
"যাক, এতক্ষণে তাহলে চিনতে পেরেছো। হুম.. ভালো আছি।"
"এত রাতে তুমি বাজার থেকে আসছিলে?"
"হুম.. আর বলো না, লাবিব মানে আমার ভাইয়ের প্রচন্ড জ্বর। ঔষধ নিতে আসছিলাম। তুমি এত রাতে..?"
লুবানার সাথে সেদিন প্রথম কথা হয় আমার। এরপর পুরোটা রাস্তা আমি আর ও অনেক কথা বলি। লুবানা বেশ হাসিখুশি একটা মেয়ে। কখন যে ওর সাথে মিশে যায়, আমি জানিনা। এরপর যতবারই ঢাকাতে এসেছি। লুবানার সাথে ঘুরেছি, বেড়িয়েছি। মেয়েটা একবারো বুঝতে দেয়নি তার কষ্টের কথা।
.
"আবির, সমাজে মানুষেরা বড়ই নির্মম। আমাকে ভালো থাকতে দেয়না।"
আমি থেমে যায়। হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা দুরে চলে আসি। গাছের তলায় এসে বসলাম। সে আমার পাশে এসে বসে। আমি লুবানার দিকে তাকাতে সে বলে "তুমি এখনো কিছু জানোনা। বাবা মারা যাওয়ার পর, সংসারে হাল ধরার মত শুধু আমি ছিলাম। ঢাকাতে চলে যায় শফিক ভাইয়ের সাথে। আমাকে নিয়ে একটি বারে বিক্রি করে দেয় ও। মাস খানিক ঠিকমতই ছিল। এরপর শুরু হয় আমার জীবনের কালো সময়। প্রতি রাতে টাকার বিনিময়ে কাজ করতে হতো আমার। ভাবতাম আমার ভাই তো ঠিকভাবে আছে। কেউ কিছু না জানলেই হবে। কিন্তু ঐ শফিক পরে এসে সব বলে। আমার ছবি দেখিয়ে অনেক কিছু প্রকাশ করে। আমি আর শহরে থাকিনা। চলে আসি এখানে। এলাকার মানুষ আমাদেরকে একঘোরি করে দিয়েছে। হিহিহি.. আমি তো এখন কিছু করিনা আবির। তবুও মানুষ কতকিছু বলে। ভালো লাগে না আর। মনে হয় যেন আমি মরে যায়, সাথে ভাইটার গালে বিষ দিয়ে মরি।"
আমি লুবানার কথা শুনে চুপ হয়ে যায়। মেয়েটাকে কিছু বলার মত কিছু খুজে পায়না। ওর হাত ধরে বললাম "চলো বাসায় যায়। আজকে কিছু ভালো লাগছে না।" লুবানা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। আমার হাত শক্ত করে ধরে বললো "এমন একটা হাত সারাজীবন ধরে রাখার জন্য কাউকে খুজেছিলাম। কিন্তু পাইনি।" আমি জোরে একটা শ্বাস নিয়ে বললাম "আমি যদি তোমার হাত সারাজীবন ধরি?" আমার কথা শুনে লুবানা হাত ছেঁড়ে দেয়। জোরে জোরে হাসতে থাকে ও। আমার দিকে হাসি মাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে "দিয়ার সাথে সেদিন দেখা হয়েছিল বুঝলে? মেয়েটা তোমাকে ভালোবাসে। বাসায় যাও, ভালোবাসার মুল্য দিতে শেখো আবির। এতকিছু জানো, ভালোবাসার মূল্য দিতে হয়, জানোনা?"
লুবানাকে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। তখনি একটা গাড়ি এসে থামলো আমাদের সামনে। হাজী মেম্বার গাড়ির মধ্যে বসে আছে। গাড়িটা রেখে, দরজা খুলে দিলেন তিনি। আমি লুবানার দিকে তাকালাম। লুবানা আমার দিকে তাকিয়ে শুকনো একটা হাসি দিল। আমি স্তব্ধ দৃষ্টিতে লুবানার দিকে চেয়ে আছি। লুবানা কোনো কথা না বলে গাড়ির মধ্যে উঠে বসলো। দরজা আটকানোর আগে সে বললো..
"বাড়িতে যাও আবির। রাতে বিশ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। পরিশোধ তো করতে হবে। আর আমার সাখে থাকবে না কখনো তুমি। ঢাকাতে ফিরে যেও। আসি। এলাকার মানুষ তোমাকে দোষারপ করুক এটা আমি চাইনা।"
লুবানা চলে যায়। আমি বোকার মত তাকিয়ে থাকি। লুবানার কথাগুলো কানে বাজতে থাকে। আমি ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। চোখের কোণে ঝাপসা হওয়া অনুভব করলাম আমি। কিছুই যেন বলার নেই আমার। আমি চলে আসি সেখান থেকে।
.
রফিক ভাই আইরিন ভাবিকে নিয়ে সেজেগুজে বের হয়েছেন। আইরিন ভাবি বেশ হাসিখুশি আছে। রফিক ভাইও অনেক খুশি। আজকে ওনাদের বাড়ির সামনে এসে কোনো বকাবকি শুনলাম না। পাশ কেঁটে ওনারা চলে যাচ্ছে। আমি আড়চোখে তাকালাম ওনাদের দিকে। ওনাদের সামনে থেকে এসে, বাড়ির গেটের দরজা খোলার জন্য হাত বাড়াতেই ডান পাশের লম্বা সরু গলির দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে যায়। একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা ব্যাগ হাতে খোড়াতে খোড়াতে চলে যাচ্ছেন। মহিলাকে আমি চিনি। দৌড়ে ওনার সামনে যায়। মাজেদা চাচি আমার দিকে তাকালো। আমি প্রশ্ন করলাম..
"কোথায় যাচ্ছেন আপনি? আর এভাবে কেনো যাচ্ছেন?"
"চলে যাচ্ছি বাবা। থাকো তোমরা।"
কখাটা বলেই তিনি কান্না লুকানোর চেষ্টা করে। আমি ওনার হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে সামনে দাঁড়ালাম। প্রশ্ন করি.. "কি হয়েছে বলুন।" তিনি ব্যাগটা নেওয়ার জন্য হাত বাঁড়ালেন। আমি সরিয়ে নিই। তিনি বলেন "আমাকে একটু বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত যেতে সাহায্য করবে? আমি ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে পারছি না।" আমি চাচির দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকালাম। হয়ত তিনি তাকানোর মানেটা বুঝতে পারে। তবুও একটু কড়া গলাতে বললাম..
"বলুন কি হয়েছে?"
"কিছু না বাবা.. একটা অনুরোধ রাখবে? আমাকে কিছু টাকা দেবে? জামাইয়ের বাড়িতে যেয়ে তোমাকে ফেরত দিয়ে দেবো। কাছে কোনো টাকায় নেই।"
"চাচি, এভাবে বলছেন কেনো? বলুন আমাকে।"
"কি বলবো তোমাকে? বৌমা আমার পায়ে লাঠি দিয়ে মেরে পা ব্যাথা করে দিয়েছে। হাঁটতে পারছি না। ছেলে আমার মরার কথা বলেছে। বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছে। বলো বাবা, সেই ছোট থেকে আদর করে রফিক কে বড় করলাম, সে আমার সাথে এমন করে। তাতে কোনো দুঃখ নেই। বৌমা আমাকে মেরেছে, সে কোনো বাথা দেয়নি। দেখো না সামনে থেকে সাদা চুলগুলো তুলে নিয়েছে টেনে। পিঠে কেঁটে রক্ত বের হচ্ছে। মেয়ের বাড়ি চলে যাবো। একটু বাস স্টান্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও।"
আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করছি। এমনিতে লুবানার জন্য রাগ করে, ভেবেছিলাম বাড়ি থেকে আজকেই ঢাকাতে চলে যাবো। আর কখনো ফিরবো না এলাকায়। কষ্ট হচ্ছিল, চাচির কথা শুনে কষ্টটা আরো বেঁড়ে যায়। আমি মুরাদ চাচাকে কল দিয়ে ডাকি। রিকশা চালায় তিনি। উনি আসে। রিকশায় বসেন তিনি। পকেট থেকে পাঁচটা এক হাজার টাকার নোট বের করে, ওনার ব্যাগে গুজে দিয়ে সেখান থেকে চলে আসি।
.
ব্যাগ প্যাক গোছাতে গোছাতে বেশ সময় লেগে গিয়েছে। বিকেল হয়ে এসেছে। আম্মা বারবার প্রশ্ন করেছে "কেনো ঢাকাতে এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছি।" আমি কোনো উত্তর দিইনি। ব্যাগ গুছাচ্ছি তখনো, এমন সময় অনুভব করি পাশে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। তাকিয়ে দেখি দিয়া দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা ব্যাগ, বেশ রেডি হয়েই এসেছে। আমি বললাম..
"কি ব্যাপার তুই কোথায় যাবি?"
"আম্মু বলেছে, তোর সাথে যেতে।"
"চাচি আবার এসব বলে? মার খাবি তুই?"
"আমি কখন বললাম আমার মা বলেছে?"
"তাহলে?"
"তোর মা, আমার আম্মু।"
আমি দিয়ার দিকে তাকালাম। সে মাথা নিচু করে আছে। আমি ব্যাগ গোছানো বন্ধ করলাম। দিয়ার বলা কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করলাম আমি। মেয়েটার সাথে ঢাকা থেকে যতবারই এসেছি, ততবারই প্রয়োজন ছাড়া যেন সময় দিইনি। আমি বললাম..
"যা সামনে থেকে।"
"কেনো যাবো? আমাকে সাথে নিতে হবে। আমার ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা। মনে আছে? তা না করে তুই চলে যাচ্ছিস।"
"হুম।"
"তুই ঘুরতে না নিয়ে গেলে তোর সাথে ঢাকায় যাবো। না হলে খাবো না, ঘুমাবো না। কিছু করবো না।"
"হয়েছে, চল কোথায় যাবি।"
"যেখানে নিয়ে যাবি। তবে ট্রেণ রাস্তায় চল। তোর হাত ধরে দুই পাতে দুইজন হাঁটতে পারবো। আমাকে ধরে রাখবি।"
দিয়ার কথার কোনো জবাব দিলাম না। রুম থেকে বের হলাম। আম্মা মুচকি মুচকি হাসছে। দিয়ার পিছনে যে আম্মা আছে, এটা বুৃজতে পেরেছি। তাই এখন দিয়াকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়াটা আমার বাধ্যবাধকতা হয়ে গেছে। দিয়াকে নিয়ে বের হলাম। মোড়ের রাস্তায় আসতে আসতে প্রায় সন্ধ্যা। সূর্য বেশ হেলেই পড়েছে। ওকে নিয়ে রিকশায় উঠতেই মুরাদ চাচা আসে সামনে। আমার দিকে তাকিয়ে বলে..
"বাবজান ঘটনা শুনছো নাকি কিছু?"
"কি চাচা..?"
"লুবানা, হাজী মেম্বরকে বিয়ে করে ফেলেছে। লুবানা হাজিরে ফাঁসায়া বিয়ে করছে। লুবানা ভালো একটা কাজ কইরে ফেলেছে। এখন বাড়িতে আইছে ওরা।"
"ওহ.. ভালো তো। মামা চলো তুমি।"
রিকশা নিয়ে চলে আসি। লুবানার কথা শুনতেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন নড়ে উঠল। তবে একটা জিনিস বেশ ভালো হয়েছে, তার ভাই একটা সু পরিচিতি পাবে। সমাজে লুবানার একটা ভালো পরিচিত হোক এটাই তো অনেক। আমি দিয়ার দিকে তাকালাম। সে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। ওর হাত নিশপিশ করছে। অপ্রকাশ্য ওর হাতের আহ্বান যেন আমার কানে জানিয়ে দিচ্ছে 'গাধা হাতটা ধর ওর।' আমি দিয়ার হাত ধরলাম। সে চমকে উঠল। এটা হয়ত আশা করেনি। দিয়ে আড়চোখে তাকালো। আমি বললাম..
"এভাবে আঁড়চোথে তাকাস কেনো?"
"ভয় করছে।"
"কিসের ভয়?"
"কিছু না, আরেকটু ভালো করে হাত ধর। যদি পড়ে যায়।"
"পড়বি না। আমি আছি তো।"
"হুম পড়বো না। আছিস তো তুই। সারাজীবন থাকবি তো?"
"চুপ থাক.. তোর হাত এত চিকন কেন? বেশি করে খাইতে পারিস না?" (আমি)
"শুনেছি বিয়ের পর মেয়েরটা মোটা হয়ে যায়।"
দুজনে চুপ থাকলাম। দিয়ার দিকে তাকানোর সাহস পেলাম না। এটা ভয় নয়, লজ্জা পাচ্ছি। হঠাৎ একটা গর্তে চাকা পড়ে। জোরে একটা ঝাকি লাগে। এক ঝাকিতে দিয়া আমার খুব কাছে চলে আসে। ওর মাথা আমার কাধে এসে লাগে। ফাজিল মেয়ে আমার কাধ থেকে মাথা ওঠায় না। ওভাবেই রাখে। আমি আর কি বলবো। চুপচাপ বসে রিকশা ভ্রমনে ব্যস্ত হয়ে যায়।
------'(সমাপ্ত)"-----
.
দুই মানচিত্র
লিখা> Abir Hasan Niloy
Comments
Post a Comment