তোমার আমার উপলব্ধি
রাত এগারোটার দিকে উত্তরার ভাড়া বাড়ির সামনে বয়ফ্রেন্ড তামিমের বাইক থেকে নামলো রুমানা। পাঁচ দিনের কক্সবাজার ভ্রমণ শেষ করে তারা মাত্রই ঢাকায় ফিরেছে।
বাইক থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তামিম বললো,
- এভাবে আর কতো রুমানা? এবার বিয়েটা তো করে ফেলা দরকার তাই না?
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রুমানা, দুই বছর আগে দাদা-দাদী ইমোশনাল কথাবার্তা বলে তাকে গ্রামের একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বিপদে পড়েছিল রুমানা। মা-বাবা হারা এই নাতনীকে তারা বিয়ে দিয়েছেন পাশের গ্রামের সবচেয়ে ভদ্র ছেলে মামুনের সঙ্গে। মামুন পড়াশোনা শেষ করে সেই গ্রামের মধ্যেই একটা স্কুলে শিক্ষকতা করে।
রুমানাে দাদার ছাত্র ছিল মামুন। ছোটবেলায় বাবা মা মারা যাবার পর গ্রামের মধ্যে এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করে রুমানা৷ তারপর ঢাকা এসে ভর্তি হয়েছে অনার্সে। এরপর থেকে জীবন যাত্রার মান অবনতি ঘটেছে রুমানার। দাদা-দাদীর ধারণা ছিল বিয়ে হলে মোটামুটি ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু রুমানা বেশ চতুর। দাদা-দাদীর কথার কাছে পরাজিত হয়ে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। আর বিয়ের সপ্তাহ খানিক পরেই কৌশলে শহরে চলে আসে রুমানা। দাদার কাছে কল দিয়ে পরিষ্কার করে জানিয়ে দেয় ওই ছেলের সঙ্গে সংসার করা সম্ভব না। শহরে পড়াশোনা করে গ্রামের এক স্কুল মাস্টারকে বিয়ে করে পল্লীবধূ হবার কোনো ইচ্ছে তার নেই।
শহরে এলে সবাই পরিবর্তন হয় না, কিন্তু রুমানা যতটা হয়েছে ততটা সত্যিই খুব খারাপ। সে তার সকল আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। প্রাপ্ত বয়স্ক হবার জন্য নিজের একাউন্টে যে টাকা আছে তা দিয়ে চলে যাচ্ছে দিনকাল। তার মা-বাবার যে টাকাপয়সা ছিল তার সবটাই তার নামে জমা করে দিয়েছিল দাদা।
দাদার সঙ্গে শেষ কথোকপথের সময় বলেছিল যে ওই ছেলের কাছ থেকে যেদিন তাকে মুক্তি করবে সেইদিন সে কথা বলবে। বৃদ্ধ দাদা জেদ করে বলেছিল যে তিনি বেঁচে থাকতে এটা সম্ভব নয়।
তারপর থেকে আট মাস ধরে পরিচিত সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তার। তবে প্রথম প্রথম বেশ কয়েকবার মামুন এসেছিল শহরে। কিন্তু রুমানা তাকে কথা বলার কোনো সুযোগ দেয় নাই।
- রুমানা বললো, দাদা যদি ও মাস্টারের কাছ থেকে আমাকে মুক্ত না করে তাহলে নিজেই কিছু করতে হবে।
- হ্যাঁ তাই করো, তুমি ওই ঝামেলাটা মিটিয়ে নাও তাহলে আমরা বিয়ে করতে পারি।
- আমার মনে হয় কাজ হয়ে যাবে, কারণ সকাল থেকে তো বাসার দারোয়ান কল দিচ্ছে। আমার দাদু নাকি আজকে বিকাল থেকে অপেক্ষা করছে। তিনি তো ঢাকায় আসার কথা নয়, মনে হয় তিনি আমার শর্তে রাজি হয়েছে।
- ঠিক আছে তাহলে বাসায় গিয়ে দেখো, আমি চলে গেলাম।
- ওকে আল্লাহ হাফেজ।
রুমানা গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে দারোয়ান এর কাছে জানতে পারলো তার দাদু সন্ধ্যার পর চলে গেছে। যাবার সময় তিনি নাতনীর জন্য একটা চিঠি রেখে গেছে। গ্রামের হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক রুমানার দাদু আজও চিঠি লিখতে বেশ পছন্দ করে।
বাসায় ঢুকে বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়লো রুমানা। একই ফ্ল্যাটে তারা চারটা মেয়ে একসঙ্গে থাকে, এরা সবাই ছাত্রী।
ঘন্টা খানিক সেভাবেই শুয়ে ছিল। তারপর চিঠিটা বের করলো পড়ার জন্য।
তোমার দীর্ঘায়ু কামনা করছি,
খুব বেশি কিছু লেখার মতো নাই। তুমি হয়তো জানো যে গত শুক্রবার শেষ রাতে বরিশালের একটা লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অনেক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, যেগুলো খবরের পাতা ভর্তি ছিল। তবে তুমি যেটা জানো না সেটা হচ্ছে তোমার স্বামী মামুন ওই লঞ্চে যাত্রী ছিল। মামুন সেই অন্ধকার রাতের আধারে আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তোমার মনের আশা পূরণ হয়েছে। অনেক সময় মানুষ যা চায় প্রকৃতি সেটা পূর্ণ করে দেয়। তোমার চাওয়া এই বিচ্ছেদটা প্রকৃতি পূর্ণ করে দিল। তোমার দাদির শরীর বেশি ভালো না। জানি না কে কখন পৃথিবী ত্যাগ করে চলে যাবো। তাই সবার সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ রেখো, জীবন তো একটাই। সেই জীবন থেকে কেউ হারিয়ে গেলে সেটা তো আর পাওয়া যায় না। যেমন তুমি তোমার মা-বাবাকে আর কি কোনদিন ফিরে পাবে বলো?
যদি কারো প্রতি রাগ অভিমান কিছু থেকে থাকে তাহলে সেটা বিদায় মুহূর্তে মিটিয়ে ফেলা দরকার। কারণ পরবর্তী দেখা হবার আগেই কেউ একজন হতে পারে পরপারের বাসিন্দা। আমার কথাটা একটু মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করো, তাহলে অনেক কিছু উপলব্ধি করতে পারবে৷
তোমার দাদু।
--- সমাপ্ত ---
ছোটগল্পঃ- উপলব্ধি।
মোঃ সাইফুল ইসলাম।
Comments
Post a Comment