কিছু আড়ালের কথা
- আমি বললাম, আপনার মুখটা একটু দেখাবেন? আজ পর্যন্ত আপনার মুখ দেখতে পারিনি।
- শুধু চোখ দেখে প্রেমে পড়ে গেলেন?
- আপনি যেমন শান্তশিষ্ট ভাবে বসে থাকেন তাতে ভালো করে দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হবে।
- আপনি মুগ্ধ হয়েছেন?
- অনেক। নাহলে কি প্রতিদিন অফিস শেষ করে এখানে আসতাম নাকি?
- আমি প্রতিদিন বিকেলে এসে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকি, ভালো লাগে।
- জানি আমি।
- কোনদিন নিজ থেকে কথা বলেননি কেন? আজ যদি আমি না ডাকতাম তাহলে তো মনে হয় কথা হতো না তাই না?
- তা ঠিক।
- আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু জানেন?
- না, এখানে এসে দেখি এতটুকুই। সন্ধ্যা বেলা আপনি যখন চলে যান তখন আমি মসজিদে যাই নামাজ পড়তে।
- আপনি কি জানেন যে আমি মাঝে মাঝে নামাজ শেষ হওয়ায় আগ পর্যন্ত বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকি।
- কোই দেখিনি তো।
- আজকের পর থেকে আমাদের যদি আর দেখা নাহয় তাহলে কি হবে?
- দেখা হবে না কেন?
- যদি...
- মন খারাপ হবে।
- আমি প্রতিদিন এখানে এসে বসে থাকি এটার পিছনে একটা বিশাল কারণ আছে। জানেন?
- না, জানতে পারি?
- হ্যাঁ পারেন। চলেন হাঁটতে হাঁটতে বলি।
মেয়েটা তার মুখের বাঁধন খুলে ফেললো। এই প্রথম আমি তার সম্পুর্ন মুখটা দেখতে পেলাম। শুধু চোখ দেখে যতটা ভেবেছিলাম তারচেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে বললো,
- দেখা শেষ?
- যদি বলি কেবল শুরু, তাহলে?
- মানে?
- জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যদি এই মুখটা দেখার জন্য আবেদন করি। তাহলে সেই আবেদন গ্রহণ করা হবে নাকি দরখাস্তের দ্বিতীয় পাতা হয়ে রয়ে যাবে অপঠিত।
- আমার সবগুলো কথা শুনে যদি এমনটা মনে হয় তাহলে এটা নিয়ে আলোচনা করবো।
- বলেন।
- আমি বিবাহিতা।
থমকে গেলাম আমি। সে আমার সঙ্গে রসিকতা করছে নাকি সত্যি কথা বলছে বুঝতে পারছি না। কারণ তার মুখে ভাবভঙ্গি অপরিবর্তনীয়, সামনে তাকিয়ে আগের মতো হাঁটছে।
- সত্যি বলছেন?
- মিথ্যা বলে আমার লাভ?
- কোনদিন তো আপনার হাসবেন্ডের সঙ্গে আমি আপনাকে ঘুরতে দেখিনি।
- আপনি যেদিন প্রথম আমাকে দেখেছেন তার মাস খানিক আগে থেকে আমরা আলাদা থাকি। এখনো বিচ্ছেদ হয়নি, তবে আমি তার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখতে চাই না।
- কেন?
- সেই বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে আমরা আরেকদিন নাহয় বেশ গল্প করবো। আমি কীভাবে বিয়ে হলো, কেন সেই জীবন ছেড়ে আমি আমার মতো করে আলাদা হতে চাই।
- আপনার স্বামী কি করেন?
- বিশাল বিজনেস আছে তার, ব্যাবসা হচ্ছে তার একটা নিজস্ব পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে সে ছাড়া আর কেউ বসবাস করে না। খুব তুচ্ছ কারণে সে প্রচুর টাকা খরচ করতে পারে।
- সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
- হ্যাঁ আমরা এখন ফিরবো, আপনি নিশ্চয়ই নামাজ পড়তে যাবেন?
- হ্যাঁ।
- কালকে কথা হবে। অপেক্ষা করবো।
মেয়েটা চলে যাবার পর থেকে বারবার শুধু ভেবে যাচ্ছি সত্যি সত্যি তার বিয়ে হয়েছে কিনা। অদ্ভুত।
নামাজ শেষ করে বেরিয়ে একটু সামনে যেতেই দুটো লোক আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি কিছু বলার আগেই বললো,
- আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।
- বলেন।
- চলেন কোথাও বসে বসে কথা বলি।
তাদের সঙ্গে হাঁটছি। হঠাৎ করে তাদের মধ্যের একজন আমার মুখের কাছে কিছু একটা ধরলো। আমি কিছু বলার আগেই অনুভব করতে লাগলাম যে আমার চারিদিকে ঘুরছে। চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
যখন চোখ মেলে তাকালাম তখন আমি একটা ঘরের মধ্যে বন্দী। আমার হাতপা বাঁধা। আমার সামনে একটা যুবক বসে আছে, তবে বয়স ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
- চিনতে পেরেছেন আমাকে?
- আমি মাথা নাড়িয়ে না বললাম।
- সন্ধ্যার আগে যে মেয়ের সঙ্গে কথা বলে বলে হাটছিলেন আমি তার স্বামী।
- ওহ্।
যদিও অবাক হলাম কিন্তু সেটা প্রকাশ করার চেষ্টা করলাম না। চুপচাপ বসে আছি।
- আমি চাই আমাদের সম্পর্ক আগের মতো হয়ে যাক তাই আপনাকে সেখানে অনুপস্থিত থাকতে হবে ভাই।
- সে তো আপনার সঙ্গে থাকবে না।
- অবশ্যই থাকবে, কিন্তু আপনার মতো কেউ যদি সেখানে তৃতীয় হয়ে আসে তাহলে আসবে না।
আপনি ওর পথ থেকে সরতে হবে। আর সেজন্য আমার যা করা লাগে, তাই করবো।
পরিশিষ্টঃ- পরদিন বিকেলে সেই আগের যায়গায় বসে আছে রেশমি। তার দৃষ্টি চারিদিকে ঘুরছে, একটা পরিচিত মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে কিন্তু সেই মুখ কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও যখন তাকে পাওয়া গেল না তখন রেশমি সামান্য হাসলো। ছেলেটা হয়তো তার বিয়ের কথা শুনে পিছিয়ে গেছে। সে এতদিন জানতো না রেশমি বিবাহিতা তাই তাকে সবসময় ফলো করছে।
রেশমি ভেবেছিল এই ছেলেটা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার কাছে তার ধারণা ভুল মনে হচ্ছে এখন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাসার দিকে রওনা দিল।
রেশমি হয়তো কোনদিনই জানতে পারবে না এই ছেলেটা আর আসবে না। তার স্বামী নিজের টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে ছেলেটাকে পৃথিবী থেকে অনেক দুরে পাঠিয়ে দিয়েছে। এ জীবনে রেশমির সঙ্গে আর দেখা হবে না তার, রেশমি হয়তো আর কোনদিনই ছেলেটার মৃত্যুর তারিখটা জানতে পারবে না।
সমাপ্ত
গল্পঃ-
কিছু আড়ালের কথা।
লেখাঃ-
মোঃ আবীদ আবরার।
Comments
Post a Comment