বেলা শেষে
"নীল দা কালই বিয়ে, আমার হবু বর নাকি বিশাল জমিদার । যদিও আমি তার প্রথম স্ত্রী নয় তৃতীয়। মা বলেছে, এইসব জমিদারের নাকি তিন চারটা বউ থাকে।"
.
ভোর হতে আর দেরি নেই। সবাই যখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন... ঠিক সেই সময় ঘরের জমাট বাঁধা অন্ধকারকে নাম মাত্র কাটানোর অাপ্রাণ প্রচেষ্টায় মেতে আছে একটা মাটির প্রদীপ। আর তাতেই ঘরের খানিকটা অংশ আবছা আলো আধারে ছেয়ে যাচ্ছে। ম্লান লালচে আলোতে দেখা যাচ্ছে দুইজন মানুষ। একজন আপাদমস্তক কালো কাপড়ে ঢাকা মেয়ে আরেকজন ছেলে। পরনে সাদা ফতুয়া। আলোর ঠিক বিপরীতে দাড়িয়ে থাকায় মেয়েটা খুব ভালো মত চোখে ধরা না পড়লেও ছেলেটির পরনের সাদা ফতুয়াটা বাতির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এবার ধরা মিহি গলায় ভেসে আসলো একটা মেয়েলী কণ্ঠস্বরে ভেসে আসলো কথাগুলো। উত্তরে পুরুষ কন্ঠ বলে উঠলো,
.
- আর কিছু বলেনি?
.
- এমন ঘরে বিয়ে হচ্ছে এটা নাকি আমার আগের জন্মের কোনো পূণ্যের ফল। সকাল বিকাল প্রার্থনা করতে বলেছে যেন বিয়েটা হয়। তুমি কিছু বলবে না নীল দা?
.
- ভালো থাকিস।
- আর কালকে?
- শহরে চলে যাচ্ছি, সকালের ট্রেন।
- আমার কোনো উপায় না করেই চলে যাবে তুমি?
- মেয়ে হলে নাম রাখিস চন্দ্রা।
- তোমার কী কিছুই করার নেই নীল দা?
.
এই প্রশ্নের জবাব অবশ্য নীল দিলো না। কেবল টেবিলের উপর থাকা বাতিটা হাতে তুলে নিয়ে মেয়েটার মুখের উপর ধরে বললো,
.
- তোর চেহারায় বিয়ে ফুল ফুটে গেছে দেখছি। তুই এখন যাহ্ কুঙ্কু। লোকে দেখলে নানান কথা রটবে।
- তাতে কী আমার বিয়ে আটকে যাবে নীল দা? তবে রটুক। আমি ভয় পাই নে।
- আমি তো পাই।
- তুমি তো ছেলে, তোমার আবার ভয় কিসের? কলঙ্কের ভয় তো মেয়েদের হয়।
- ও তুই বুঝবি না। ভোর হতে চললো, তুই এখন যাহ্।
.
কথাটা বলেই সামনে থেকে সরে আসে নীল। আর তখনই একটা ধপ করে শব্দে আবার ফিরে তাকায়। কুঙ্কু মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। শরীরটা খানিক পর পর একটু দুলে দুলে উঠছে। তারপর কাঁন্নাটা ক্রমেই ফুঁপিয়ে তারপর গোঙ্গানির মত শোনাতে লাগলো। মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সে । তারপর পাশে থাকা কাঠের চেয়ারে বসে পড়ে। বাইরের অন্ধকার ক্রমেই মিলিয়ে আসতে শুরু করেছে। দিনের আলো ফুটতে আর বেশি দেরি নেই। সেটা ভেবেই বোধহয় মেয়েটা এবার উঠে বসলো। তারপর নীলের দিকে তাকিয়ে বললো,
.
- যদি সময় পাও তাহলে একবার আমার শ্বশুর বাড়িতে এসো।
- আসবো।
.
উত্তরে আরও কয়েক মূহুর্ত একই ভাবে বসে থাকে মেয়েটি। আর তারপরই কানে আসে দরজাটা খোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ। বেশ কিছুক্ষণ এক মনে বসে থাকে নীল। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় খোলা দরজাটার দিকে। বাইরের পরিবেশটা একবার দেখে নিঃশব্দে অতি সাবধানে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু পুরোনো দিনের বেরসিক দরজাটা এই সাবধানতার কোনো তোয়াক্কা না করেই আবারও ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেলো। তাতে অবশ্য ক্ষতি নেই, কারণ এই সময় কারও জেগে থাকার কথা নয়। আর জেগে থাকলেও সে পুরুষ মানুষ, তার ভয় কিসের। রাত বিরাতে বাড়িতে ফিরলেও তাকে তো আর কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না।
.
কুঙ্কুর বিয়েটা আর দেখে যাওয়া হবে না। মেয়েটাকে কনে সাজে কেমন লাগে সেটা দেখার অনেক দিনের সাধ ছিলো ওর। মজার ছলে হলেও বেশ কয়েকবার কথাটা বলেছিলো কুঙ্কুকে। মেয়েটি প্রতিবারই মুখ বেকিয়ে বলেছিলো,
- আহা, কত শখ, কনে সেজে তোমাকে দেখাতে বুঝি আমার বয়েই গেছে।
.
সেও প্রতিবার এই কথার উত্তরে বলেছিলো,
- তা সাজবি কেনো? সাজবি তো কোনো বুড়োর জন্য। যদিও আমি হলফ করে বলতে পারি তোর কপালে এইসব বিয়ে টিয়ে হবে না।
.
মানুষ যা বলে তা সব সময় সঠিক হয় না। নীলের ক্ষেত্রেও হয়েছে তেমন। বিয়েটা হচ্ছে, বেশ বড় ঘরেই হচ্ছে। কুঙ্কুর বউ সাজাও হবে। কিন্তু সেই কনে বেশে মেয়েটাকে দেখা হবে না ওর। সকালের ট্রেনেই যেতে হবে শহরে। বাবার কড়া নিষেধাজ্ঞা, নিচু ঘরের মেয়ে আর যাই হোক চাটুর্জি বাড়ির বউ হতে পারে না। বাবার মুখের উপর সেদিন কোনো কথা বলতে পারেনি সে। কেবল মাথা নিচু করে দাড়িয়ে ছিলো বেশ কিছুক্ষণ। বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর চোখ তুলে একবার তাকিয়েছিলো মায়ের দিকে। নীরব অসম্মতি আর স্বামীর কথার উপর অগাত শ্রদ্ধা ফুটে উঠতে দেখে মাকেও সেদিন কিছু বলতে পারেনি ও। শেষ বারের মত তাকিয়েছিলো বড় দাদার দিকে। দাদার চোখে ছিলো ওর প্রতি সহানুভূতি। তাই আর কোনো কথা না বলেই নীরবে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যেতে হয়েছিলো ওকে। ইচ্ছে ছিলো সেদিনই কলকাতা ফেরার। কিন্তু পারেনি। হাজার হলেও মা তো, তার চোখের পানিকে উপেক্ষা করে এত সাহস কার?
.
এর পর বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেছে। অনেক বার চিঠি পেয়েও গ্রামে আর ফেরা হয়নি নীলের। হয়নি বললে ভুল হবে ফিরেইনি বলা চলে। যোগাযোগ বলতে কেবল ঐ বড় দাদা বিক্রম চাটুর্জির সাথেই, প্রথম দিকে মাসে মাসে কলকাতায় এসে ভাইকে হাত খরচ বাবদ কিছু নগত টাকা দিতে সে নিজে আসলেও, বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেটাও বন্ধ হয়েছে। টাকা আসে, তবে খামে। সাথে একটা চিঠি। তেমন কিছুই লেখা থাকে না সেখানে। সেই এক কথা, লেখাপড়া শেষ হয়েছে, এবার গ্রামের ছেলে ঘরে ফিরে এইদিকটা সামলানো হোক। নীল অবশ্য এই সবের কিছুই উত্তরে লেখে না, কেবল সে যে টাকাটা পেয়েছে তারই একটা লিখিত বয়ান স্বরূপ দুই এক লাইনের পাত্র লেখেই দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু এবারের চিঠির উত্তরটা এমন দায়সারা ভাবে দেওয়া চলে না। কারণ চিঠিটা লেখেছে শকুনতলা দেবী নিজে। ছেলে সেই যে গ্রাম ছেড়েছে, এর পর শকুনতলা দেবী তখনোই ছেলেকে একটা বারের জন্যেও পত্রাঘাত করেনি।
.
খোকা,
যদি সম্ভব হয় তবে একটিবার আসিস। তোর বাবার শরীরটা ইদানিং ভালো যাচ্ছে না। তোকে দেখার শত বাকুলতা থাকলেও নিজের জেদ আর আত্মঅহমিকার কারণে লেখতে চায় না। যদি সুযোগ আর সময় করে উঠতে পারিস তবে একটিবার দেখে যাস। যদি তা না করে উঠতে পারিস তবে এই মাসের টাকাটা পাঠিয়ে দিলাম।
.
চিঠিটা পনেরো দিন আগের পাঠানো। অথচ আজ সকালেই ডাক অফিসের একজন পিয়ন এসে ওর হাতে দিয়ে গেলো। এইদেশে যোগাযোগের উন্নতি চিঠিতে হবে বলে তো মনে হয় না। কিন্তু বিশ্বে মাতৃশক্তি একটা বড় শক্তি। বাবার প্রতি অভিমান, মায়ের সেদিনের নিরব অসম্মতি সব জেনো কোথায় উড়ে গেলো। আর তার থেকেও বড় কথা বাবা অসুস্থ। যে বাবা ছোট বেলায় কত আদর করেছে, হাত ধরে হাটতে শিখিয়েছে। সেই বাবা অসুস্থ। জমাট বাঁধা অভিমানের মেঘটা কোথায় যেনো উবে গেলো। চিঠিটা পেয়েই আর কাল বিলম্ব করে না নীল। সন্ধ্যের ট্রেনেই রওনা দিলো।
.
তিন দিন পর যখন যখন গ্রামের অক্ষাত স্টেশনে এসে নামলো তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। সেই চির চেনা রেল স্টেশন। মনটা কেমন যেনো করে উঠলো নীলের। মাতৃভুমির এ এক অদ্ভুত টান। মানুষ চাইলে হাজার বছর অন্য জায়গায় থাকতে পারে, কিন্তু মাতৃভুমির প্রতি যে অগাত অাকর্ষণ আর ভালোবাসা সেটা কমবার নয়। এই বাতাসে কেমন এক অদ্ভুত স্নেহময়ী ঘ্রাণ থাকে, যা নিমিষেই স্বদেশের মানুষকে বিমুগ্ধা করে ফেলে। নীলেরও হয়েছে তাই।
.
গ্রামের রাস্তা ধরে হাটছে, হঠাৎ-ই চোখে পড়লো তার দিকেই কে যেনো এগিয়ে আসছে দ্রুত পায়ে। খানিকটা আসতেই লোকটাকে চিনতে পারলো নীল। এটাতো তাদের বাড়ির চাকর গনিপতি। আরও দ্রুত পা চালায় নীল। কাছাকাছি আসতেই বৃদ্ধ গনিপতি কেমন যেনো ফ্যাঁলাফ্যাঁলা করে তাকিয়ে থাকলো ওর দিকে। আর তারপর.......তারপর... ঢুকরে কেঁদে উঠলো।
- ও ছোট ঠাকুর দা গো, তোমার এই আসার সময় হলো ঠাকুর দা? এইদিকে সব শেষ হয়ে গেছে গো ঠাকুর দা।
.
গনিপতির হঠাৎ এমন আচরণে নীল খানিকটা দমেই গেলো। হঠাৎ গনিপতির এমন আচরণে বেশ খানিকটা থতমত খেয়ে গেলো। আমতা আমতা করে বললো,
- কী হয়েছে গনি কাকু?
প্রশ্নটা শুনে গনিপতির কাঁন্নার বেগ যেনো আরও বেড়ে গেলো। কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
- বড় ঠাকুর আর নেই, ঠাকুর দা। একটু আগেই চিতায় তুলে দিয়ে আসলেম। ঠাকুরানী তোমাকে চিঠি লিখেছিলো পনেরো দিন আগে। তখনই বড় ঠাকুরের খুব খারাপ অবস্থা ছিলো। তারপর সব শেষ, তোমাকে তো অনেক গুলো চিঠি লেখেছে, পাওনি? পরে যখন তুমি আর এলে না তখন সবাই বাধ্য হয়ে.......
.
কথাটা পুরোপুরি শেষ করতে পারে না গনিপতি। কাঁন্নার রোল যেনো আরও বেড়ে যায় কয়েকগুন। নীলের মনে হচ্ছিলো কিছুক্ষণের জন্য পায়ের নিচ থেকে মাটিটা সরে গেছে। হতবম্ভের মত গনিপতির দিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর..... কেঁদে ফেললো। বেশ কিছুক্ষণ এমন ভাবে কাটার পর অবশেষে কাঁন্না জড়িত কণ্ঠে উচ্চারিত হলো,
- পনেরো দিন আগের চিঠিটা তিন দিন আগেই পেয়েছি গনি কাকু। যদি তখনই পেতাম তাহলে এতটা দেরি করতাম না। সত্যিই এতটা দেরি করতাম না। বিশ্বাস করো মায়ের চিঠিটা আমি সোমবার সকালে পেয়েছি। আর পেয়েই সন্ধ্যের ট্রেনে রওনা দিয়েছি।
.
- যা হবার সে তো হয়েই গেছে ঠাকুর দা। তুমি এবার বাড়ি চলো, মেজ ঠাকুর দা তোমাকে আরেকটা চিঠি লিখেছে। ডাকে ফেলতে যাচ্ছলাম । এই নেও....।
.
- তার আর কাজ কী বলো, তুমিই রেখে দেও। আমি বাড়ি যাই।
.
কথাগুলো বলতে বলতে ধীরে ধীরে হাটতে থাকে নীল। পথ বেশি দূরের নয়, কিন্তু আজ যেনো সেটা হাজার ক্রোশ। পথ যেনো শেষ হতে চায় না। শরীর অবশ হয়ে আসছে। হাটার শক্তিও কমে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে।
.
অবশেষে সে যখন বাড়ি ফিরলো তখন বাড়িতে লোকের ভীড়। নীলকে দেখতে পেয়েই একজন এগিয়ে আসলো সেদিকে। বললো,
- চিঠি পাওনি ছোট ঠাকুর ?
- মায়ের চিঠি পেয়েছি সোমবার সকালে।
- আর মেজ ঠাকুরের?
- পাইনি।
- তুমি আসছো না দেখে দেহ আর রাখতে পারিনি। আজ সকালেই চিতায় তুলে দিয়ে এসেছি। তোমার বাবার ইচ্ছে ছিলো মুখের আগুনটা তুমিই দিবে।
- কে দিলো?
- মেজ ঠাকুর।
- দাদা কোথায়?
- ভেতরে। চলো তোমাকে নিয়ে যাই।
.
লোকটা যখন নীলকে ভেতরে নিয়ে গেলো তখন দেখলো বিক্রম চাটুর্জি ঘরের ভেতরে চেয়ারে চোখ দুটো বুজে বসে অাছে। পায়ের শব্দ শুনে বিক্রম চাটুর্জি দরজার দিকে তাকালো। ছোট ভাইকে এক নজর ভালো করে দেখে আবারও আগের মত চোখ বন্ধ করলো।
নীল পাশে দাড়াতেই বিক্রম চাটুর্জি চোখ বন্ধ করেই বেশ গম্ভীর স্বরেই বললো,
.
- এসেছো তাহলে? যাক ভালোই হয়েছে। গনিপতির সাথে দেখা হয়েছে? স্টেশনের দিকেই তো পাঠালাম।
-হয়েছে।
-বেশ, তাহলে তো সব জেনেই গেছো। এখন সবটা ভালোই ভালোই শেষ হোক।
- চিঠিটা নিইনি দাদা।
- ওমম নেওনি! ওহ্, বেশ তাতে ক্ষতি নেই, এসেই যখন পড়েছো তখন সামনা সামনিই সব কথা হবে। তাছাড়াও আরও দশজন আছেন। সবাই ভালো মন্দের বিচার করতে জানেন। তারা যা ভালো বোঝেন করবেন।
.
বিক্রম চাটুর্জির এমন কথা শুনে নীল খানিকটা অবাকই হলো। বললো,
- তুমি কিসের কথা বলছো দাদা?
- কিসের আবার বলছি.......
নিজের কথাটা পুরো শেষ করতে পারে না বিক্রম চাটুর্জি। তার আগেও একজন মহিলা বলে উঠলো,
- আহ, ছেলেটা আসতে না আসতে কী শুরু করলে বলো তো? এইসব কথা তো পরেও বলা যাবে নাকি? চলো তো ঠাকুর পো, কতটা পথ আসলে, যাও হাত মুখ ধুবে ক্ষণ, আমি খাবার বাড়ছি।
.
নীল কিন্তু এইসব কথার কোনো জবাব দিলো না। এক দৃষ্টিতে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দাদার দিকে। মানুষটাকে কেমন যেনো তার অচেনা মনে হচ্ছে। তার দাদা তো এমনটা ছিলো না। তাহলে?
.
- তুমি কিসের কথা বলছো দাদা?
- আহ, ঠাকুর পো রাখো তো।
- বৌদি, আমাকে শুনতে দেও। কি হলো দাদা বলো....
- দেখো তুমি এখনো ছোট নেই, তাই আশা করি তোমাকে সবটা বলে দিতে হবে না। আর যদি বলতে হয় তবে আমি জমাজমির কথায় বলছি।
.
কথাটা শুনে নীলের মাথায় যেনো বজ্রাঘাত হলো। সম্পদের কথা বলছে? তার মানে ভাগাভাগি? কিন্তু নীল তো এইসব চায়নি কোনো কালেই, তাহলে আজ হঠাৎ এইসব কথা উঠছে কেনো? গলাটা ভারী হয়ে আসে নীলের। ধরা গলায় বলে,
.
- কিন্ত দাদা আমি তো সে সব চাই না। তাছাড়া এইসব কথায় বা উঠছে কেনো? যেমন আছে তেমন থাকুক না।
- সেটা বললে তো হয় না, তুমি বাবার সন্তান, তাই তোমার একটা পাওনা আছে। তাছাড়া তুমি যেমন করে চলছো তেমন করে আর কতদিন?
- হাত খরচের টাকাটাও আর চাই নে দাদা। বাবা যতদিন ছিলো ততদিন নিয়েছে। আর চাইনে। মাকে এইসব বলো না। আর আমি থাকতে আসিনি, কাল সকালেই চলে যাবো।
.
কথাটা বলে আর বিন্দুমাত্রও দাড়ায় না নীল। বুকের ভেতরটা কেমন যেনো মোচড় দিয়ে উঠছে। ঘর থেকে বের হতে হতে কানে আসলো,
- কী দরকার ছিলো এখনই এইসব বলার? দিলে তো ছেলেটার মনটা ভেঙে? এমনিতেই বাবাকে শেষবার চোখের দেখাটাও দেখতে পারলো না বেচারী। আর তার উপর.....
- তুমি চুপ করো, যা বলেছি বেশ করেছি। আরও আগেই বলার দরকার ছিলো।
.
একে তো পিতৃবিয়োগ তার উপর প্রানপ্রিয় দাদার কাছ থেকে এমন আচরণ, যেটুকু শক্তি ছিলো সেটাও যেনো মিলিয়ে গেলো। সে তো কিছুই চায়নি, বরং ভেবে রেখেছিলো যে সবকিছু দাদাকে দিয়ে ও ফিরে যাবে কলকাতায়। এরপর আর আসবে না, হ্যাঁ মা আছেন। আর একটা বারের জন্য আসার প্রয়োজন।
.
ক্ষত বিক্ষত হৃদয় নিয়ে সে শকুনতলা দেবীর ঘরে গিয়ে দেখলো তিনি তক্তপোশের উপর শুয়ে আছেন। পায়ের শব্দে উঠে বসলেন। ছেলেকে দেখো চোখদুটো ভিজে উঠলো বৃদ্ধার। বললেন,
- হ্যাঁ রে খোকা, এতটা অভিমান করতে হয় বুঝি?
.
নীল কিন্তু কিছু বলতে পারলো না। তক্তপোশের পাশে হাটু ভেঙে বসে পড়লো। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতে লাগলো ছোট বাচ্চার মত।
.
- নিজের চেহারার এ কি হাল করেছিস রে খোকা? খাওয়া দাওয়া করিস না নাকি ঠিকমত?
.
এবারও নীল চুপ, কান্না বেগ আরও বাড়তে থাকে। সেই সাথে শকুনতলা দেবীরও ভিজে উঠে চোখের কোণ।
.
- চিঠি সময় মত পাইনি মা।
.
এতটুকু বলার পর আর কোনো কথা বলতে পারলো না, মাথাটা লুটিয়ে পড়লো শকুনতলা দেবীর কোলের উপর।
.
পরের দিন যখন নীল ফেরার জন্য বেরিয়েছে ঠিক সেই সময় বিক্রম চাটুর্জি বললো,
- বলেছিলাম সবটা মিটিয়ে যেতে। আজই চলে যাচ্ছো যে?
- আমার কিছু চাই নে দাদা। সব কিছু তোমারই থাকুক।
-সেটা বললে তো আর হয় না, তাছাড়া পাছে কোনো ঝামেলা হলে?
.
বিক্রম চাটুর্জির দিকে মাথা তুলে তাকালো নীল। এই কয় বছরে এতটা পরিবর্তন? পাছে কিনা কোনো ঝামেলা হতে পারে সেই ভয়ে এখনই তার সবটা মিটিয়ে রাখতে চায়? এতটুকু বিশ্বাস? বললো,
.
- সব কিছু তৈরি হতে কতদিন লাগবে?
- তা বলতে পারি না, তবে দিন সাতেক তো লাগবেই।
- বেশ, তবে তাই হোক সাতদিন পরেই না হয় যাবো।
.
অবশেষে সেই সপ্তম দিন আসলো। ফিরবো ফিরবো করতেই হঠাৎ-ই মনে পড়ে গেলো কুঙ্কুকে দেওয়া কথাটা। একটা বার মেয়েটা ওর শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার কথা বলেছিলো ওকে। নীল শুনেছিলো, কলকাতা যাওয়ার পথে কোনো একটা স্টেশনে নেমে কুঙ্কুর শ্বশুর বাড়ি যেতে হয়। কিন্তু সঠিক ঠিকানাটা শোনা হয়নি। মনে মনে কি যেনো আকাশ পাতাল ভাবলো সে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে হাটতে লাগলো মাধব ঘোষালের বাড়ির দিকে।
.
গ্রামের শেষ দিকটায় এই মাধব ঘোষালের বাড়ি। এই কয়দিনে একবারের জন্যও সেদিকে যাওয়া হয়নি ওর। অথচ একটা সময় ছিলো প্রতিদিনই যাওয়া হতো। কোনো কাজ না থাকলেও কুঙ্কুর জন্য। আজ এতদিন পর সে চেনা পথটা যেনো অনেকখানি অচেনা হয়ে গেছে। নতুন কিছু বাড়িও উঠেছে এই কয় বছরে। বেশ কিছুক্ষণ ধীর গতিতে নানান চিন্তা করতে করতে নীল যখন মাধব ঘোষালের বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো, তখন মনের অজান্তেই একটা বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো ওর। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। প্রথম দুইবার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের না হলেও তৃতীয় বার গলাটা খানিকটা পরিষ্কার করে ডাকলো উচ্চস্বরে।
- মাধব কাকা, বাড়ি আছেন ?
.
প্রথম দুইবার ভেতর থেকে কোনো সারাশব্দ না আসলেও পরে একজন মেয়েলোক ভেতর থেকে যথাযথ আত্ম সংবরণ করে বললো,
- বাবা বাড়ি নেই।
.
" বাবা বাড়ি নেই " তবে কী কুঙ্কু? কারণ মাধব ঘোষালের আর তো কোনো মেয়ে নেই। কিন্তু তাই বা হয় কীভাবে? সে তো এখন.........
.
প্রশ্নের উত্তর মিললো ভেতর থেকে দরজা খোলার পরই। একজন অল্পবয়সী স্ত্রীলোক আপাদমস্তক সাদা কাপড় টেনে উঁকি দিয়ে বাইরে আগন্তককে একবার দেখে নিয়েই আবারও চট করে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। আর সেই মুহূর্তের দেখাতেই নীল যা দেখলো তাতে পুরো শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেলো। না চোখের ভুল হতেই পারে না। কারণ ক্ষণিকের দেখা সে মুখটাকে সে ভুল করতেই পারে না কখনো। মেয়েটা কুঙ্কুই।
.
নীল মুর্জোমানের মত দাড়িয়ে রইলো, সব কিছু যেনো তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। তবে এমন পরিস্থিতির স্থায়িত্ব হলো না বেশিক্ষণ। তার আগেই নীল দেখলো সেই স্ত্রীলোকটা আবারও বেরিয়ে এসেছে।
কিন্তু এবার আর মুখ দেখা যাচ্ছে না। চেহারার উপর লম্বা একটা ঘোমটা টানা। যদিও মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবুও বুঝতে অসুবিধে হলো না এতটুকুও। হতবম্ভের মত দাড়ালো রইলো সে। মুখ দিয়ে যেনো কথা বেরিয়ে আসছে না, সব কথাগুলো যেনো গলার ঠিক মাঝখানটায় দলা পাকাতে শুরু করেছে।
.
- জানতাম তুমি এসেছো।
- জানতি? তাহলে আসিসনি কেনো?
- বাহ রে, এইভাবে যেতাম বুঝি? যাকে কনে সাজে দেখাতে পারিনি, তাকে বিধবা সাজে দেখায় কোন সাহসে?
- কিন্তু......
- ঘোষালের মেয়ে আমি নীল দা, কপালে সুখ সইবে কেন? বছর পার হয়নি, সতিনের ছেলেরা অবশ্য তাড়িয়ে দেয়নি, কিন্তু সেই যখন নেই তখন আমার আর থেকে কাজ কী বলো?
.
নীল আর কোনো কথা বললো না। কেবল মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকলো বেশ কিছুক্ষণ। বুকের ভেতর কে যেনো একটা হাতুড়ি পিটছে অনরবত। চট করে মাথা তুললো নীল। তাকালো কুঙ্কুর দিকে। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতরে চেপে রাখা কথাটা এবার বলেই ফেললো,
- যাবি আমার সাথে? কলকাতা? খুব তো বলতি কলকাতা নিয়ে যাওয়ার কথা। যাবি?
.
কুঙ্কু আর সেই আগের বাচ্চা মেয়েটি নেই, বয়স বেড়েছে। বোঝবার ক্ষমতা এসেছে। তাই নীলের এই ইঙ্গিতটা বুঝতে খুব একটা অসুবিধে হলো না কুঙ্কুর। ঘোমটার আড়ালেই একটু মৃদু হাসে মেয়েটা। তারপর বলে,
- কিন্তু নীল দা, আমি যে বাসি পাত বাড়তে পারবো না । তুমি এখন যাও নীল দা, এখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে আমার সাথে কথা বললে লোকে তোমায় মন্দ বলবে।
- আর তোর?
- আমার আবার ভয় কী? ঘর পোড়া গরুর আগুনের ডর কী । কিন্তু তুমি তো তেমন নও। তুমি বরং যাও।
.
কুঙ্কুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে বেশ কিছুটা সময়। বুক চিরে বেরিয়ে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস। বুকটা কেবলই হু হু করে উঠছে। আর কোনো কথা বলার সাহস হয় না ওর। মেয়েটার বুদ্ধি হয়েছে।
.
সকাল দশটার ট্রেন না ধরলে সেই সন্ধ্যায় ফিরতে হবে। এতটা সময় এখানে কী করবে সে? তার চেয়ে বরং স্টেশনের দিকে হাটা যাক। বেলা তো অনেক হলো।
.
__________ সমাপ্ত
.
গল্পের নামঃ বেলা শেষে।
.
লিখেছেনঃ সজীব মাহমুদ নীল
Comments
Post a Comment