কাঁদা মাখানো লাল জামা

বস্তি থেকে বের হবার সময় মরিয়মের দিকে তীব্র লালসার চোখে তাকিয়ে থাকে দোকানদার আজমল। স্বামী ছাড়া মরিয়মের উপর তার নজর অনেক দিন আগে থেকে নিবদ্ধ। কিন্তু মরিয়ম তাকে একদমই পাত্তা দেয় না বরং সবসময় তাকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে। 

- কি ব্যাপার মরিয়ম কোই যাও? 

চুপচাপ হাটে মরিয়ম। তারপর আজমল আবার বলে, 

- বাসায় কাজ করতে যাও বুঝি? তোমাকে তো কতবার বললাম আমার ঘরে আসো, বাসায় আর কাজ করতে হবে না। তোমার মেয়ে আর তোমার দুজনের দায়িত্ব আমি নেবো। 

কোনকিছু না বলে চুপচাপ হেঁটে চলে যায় মরিয়ম। সে জানে এই লোকের সঙ্গে কথা বলার কোনো অর্থ নাকি। সবসময় এমন করে কথা বলা লোকটা অভ্যাস করে ফেলেছে। 

★★

থালাবাসন সবগুলো ধোয়া শেষ করে মরিয়ম তার মালিকের কাছে গিয়ে বললো, 
- আপা আমি তাহলে আসি? " 

কর্ত্রী একটা প্যাকেট হাতে দিয়ে বললো,
- তোমার মেয়েকে ঈদের দিন পরতে দিও, বাচ্চা মানুষ খুব খুশি হবে। 

মরিয়মের চোখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। সে জানে যে গতকাল এরা সবাই শপিং করেছে, কিন্তু তার মেয়ের জন্য কিছু কিনে আনবে ভাবতে পারেনি। মরিয়ম এ বাড়িতে কাজ করে মাত্র মাস খানিক ধরে। এর আগে অন্য বাড়িতে কাজ করতো। 

আনন্দ নিয়ে সে একপ্রকার দৌড়ে রেললাইনের পাশে বস্তিতে এসে গেল। পাঁচ বছর বয়সী তার বাপ মরা মেয়েটা বস্তির সামনেই খেলছিল। তাকে ডাক দিয়ে কোলে নিয়ে নিজের ভাঙ্গা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো মরিয়ম। ভাঙ্গা একটা চৌকিতে ময়লাযুক্ত বিছানায় বসে মেয়েকে রেখে হাতের প্যাকেটটা খুলতে লাগলো। 

ছোট্ট চাঁদনী মায়ের পাগলামি কান্ডকারখানা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তার চোখে বিরক্ত, সে বাহিরে খেলা করছিল আর সেখান থেকে তাকে নিয়ে এসেছে তার মা। 

কিন্তু মা যখন লাল টুকটুকে একটা জামা বের করলো তখন মায়ের হাত থেকে ছো মেরে নিয়ে গেল জামটা। তারপর কচি কণ্ঠে বললো, 

- এটা কি আমার জন্য মা? 

- হ্যাঁ মা, তোমার জন্য নিয়ে এসেছি। তোমার কি পছন্দ হয়েছে? 

- খুব,, তুমি টাকা পেলে কোথায় আম্মু? 

- এটা তোমার এক নানি দিয়েছে। আমি যেখানে কাজ করি সেই বাসার এক নানি। 

- ওনাকে বলবা আমি অনেক খুশি হয়েছি। আমি এখন জামাটা পরবো মা? 

- না মা, তোমার নানি বলেছে কোরবানির দিনে এটা তোমাকে পরতে হবে। সেদিন আমি তোমাকে আরো কিছু কিনে দেবো। 

ছোট্ট চাঁদনী মন খারাপ করে বসে রইল। মরিয়ম নিজের মেয়েকে কোলে নিয়ে বারবার বোঝাতে লাগলো। বাচ্চাদের ভুলানো অনেক গল্প করতে আরম্ভ করলো মরিয়ম। 

★

পরদিন সেই বাসা থেকে কাজ করে বস্তিতে এসে দেখে চাঁদনী ঘরে নেই। জামার খোলা প্যাকেট তখন পড়ে আছে বিছানায়। এমনিতেই বস্তিতে ঢোকার সময় দোকানদার আজমলের সঙ্গে দেখা হয়েছে। লোকটা প্রচুর খারাপ, মুখের ভাষা খুব বিশ্রী তাই তার সঙ্গে কথা বলতে চায় না মরিয়ম। কিন্তু স্বামী ছাড়া মরিয়মের দিকে সবসময়ই কুনজর দেয় দোকানদার আজমল। 

আজমলের কারণে মেজাজ এমনিতেই খারাপ। তার উপর মেয়ে তাকে না জিজ্ঞেস করে জামা বের করে পরেছে তাই রাগ বাড়তে লাগলো। 
ঘর থেকে বেরিয়ে চারিদিকে খুঁজতে লাগলো ছোট্ট চাঁদনীকে। অবশেষে রেললাইনের পাশে যখন তাকে পাওয়া গেল তখন আরও বেশি বিরক্ত হয়ে গেল মরিয়ম। 

নতুন জামায় কাঁদা মেখে একাকার অবস্থা করে ফেলেছে ছোট্ট চাঁদনী। খপ করে মেয়ের হাতটা ধরে সেখানেই দুটো চড় বসিয়ে দেয়। ছোট্ট চাঁদনী কাঁদতে শুরু করে, তাকে জোর করে সেখান থেকে নিয়ে আসে মরিয়ম। 

বিভিন্ন বকাবকি করতে থাকে, কিন্তু অবুঝ শিশু ছোট্ট চাঁদনী কিছু বুঝতে পারে না। সে শুধু জানে তার মা তাকে মেরেছে আর সে ব্যথা পেয়েছে তাই কান্না করে।
ঘরের মধ্যে রেখে রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে যায় মরিয়ম। মেয়ের উপর রাগ করতে গিয়ে কষ্ট আর দুর্দশার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। চোখের পানি আর বন্ধ হতে চায় না। 

ঘন্টা খানিক পরে কাঁদতে কাঁদতে কাঁদা মাখানো নতুন জামা পরে বিছানায় ঘুমিয়ে গেল চাঁদনী। ঘরে ফিরে ঘুমন্ত মেয়ের কপালে হাত দিয়ে চুপি চুপি কান্না করে মরিয়ম। বেঁচে থাকার এই একমাত্র সম্বল তার, ছোট্ট চাঁদনী ছাড়া এ জীবনে আর আপন কেউ নেই। 

মরিয়মের কান্না শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায় চাঁদনীর। সে চোখ মেলে তাকিয়ে তার মায়ের কোলে উঠে বসে। 
তারপর সেই কোমল কণ্ঠে বললো, 

- আমি আর জামা পরবো না না আম্মু, তুমি আর কান্না করো না। 

মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবার হুহু করে কেঁদে ওঠে মরিয়ম। তারপর বলে, 

- আমিও আর তোমাকে মারবো না মা, তুমি এই জামা পরো কিছু বলবো না। 

- জামা তো কাঁদা লেগে গেছে। 

- তুমি এখন নুডলস খাবে, আমি একটু বাজার থেকে আসতেছি। তারপর তোমাকে গোসল করিয়ে দেবো আর জামা ধুয়ে দেবো। কাঁদা তো শুকিয়ে গেছে তাই না? 

- আচ্ছা ঠিক আছে। 

মরিয়ম তার মেয়েকে মেয়ের পছন্দের খাবার নুডলস বের করে দিল। তারপর বিছানার নিচ থেকে ১০০ টাকার একটা নোট নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল মরিয়ম। 

কাছেই একটা কাঁচাবাজার থেকে ৪০ টাকার মাছ আর ৪০ টাকার তরকারি কিনে আধা ঘণ্টা পরে যখন বস্তির সামনে এলো তখন গলির মধ্যে একটা ভিড় চোখে পরলো। একটা মহিলা দৌড়ে এসে বললো, 

- ও মরিয়ম তোর মাইয়া তো আর দুনিয়ায় নাই। গাড়িতে তোর মাইয়ার জীবন বাইর কোইরা দিছে। 

হাতের মাছ তরকারি ফেলে দিয়ে ভিড়ের মধ্যে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল মরিয়ম। কাঁদা মাখানো নতুন লাল জামা পরে রক্তে রঙিন হয়ে চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট চাঁদনী। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটা চিৎকার দিল মরিয়ম। উপস্থিত সকল মানুষের চোখে তখন অশ্রু টলটল করে। 

মরিয়ম বাজারে যাবার পরপরই বস্তির সামনে রেললাইনের ওপারে রাস্তায় একটা হাতি আসে। নুডলস খাওয়া বাদ দিয়ে বস্তির অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে হাতি দেখতে চলে যায় চাঁদনী। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তারা যখন হাতি দেখছিল তখন একটা ট্রাক আসে রাস্তা দিয়ে। হাতি সাইডে চলে আসে আর বাচ্চারা দৌড় দিতে যায়। পরিস্থিতির এক পর্যায়ে ছিটকে যায় চাঁদনী, কিছুক্ষণ আগে মায়ের বকা খাওয়া চাঁদনী হারিয়ে যায় পরপারে। 
পরনে তার কাঁদা মাখানো লাল জামা। 

সমাপ্ত 

গল্পঃ- কাঁদা মাখানো লালজামা। 
লেখাঃ- মোঃ আবীদ আবরার।

Comments