ভুল সিদ্ধান্ত
১৩-০৭-১৯৯৭
শাশুড়ী আম্মা আমার হাতটা ধরে বললেন,
- মানুষের সংসারে এমন রাগারাগি হয়েই থাকে, তাই বলে নিজের সংসার ছেড়ে কেউ চলে আসে বৌমা?
- আম্মা আপনি সবকিছু জানেন না তাই এভাবে কথা বলতে পারেন, কিন্তু আমার পক্ষে সত্যি আর সম্ভব না।
- আমি নিজে থেকে তোমাকে নিতে আসছি, তুমি কি যাবে না আমার সঙ্গে?
- আম্মা আমি আপনাকে নিজের মায়ের মতো সম্মান করি, আপনার কথার অবাধ্য হবার শক্তি নেই। কিন্তু এমন কোনো কথা বলবেন না যেটা রক্ষা করা আমার দ্বারা অসম্ভব। তাহলে মনে মনে আমিও কষ্ট পাবো, আর আপনি ও আঘাত পাবেন।
- তোমাদের আসল সমস্যাটা কি জানতে পারি?
- আপনার ছেলের কাছেই জেনে নিয়েন, অন্তত এটুকু জেনে রাখতে পারেন যে আমি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে স্বামী সংসার ত্যাগ করিনি।
- আল্লাহ তোমাদের একটা ছেলে দিয়েছে, নাতিটার মুখের দিকে তাকিয়ে নাহয় ফিরে চলো।
- ওকে আমি নিজেই মানুষ করতে পারবো আম্মা। আপনার যখনই দেখতে ইচ্ছে করবে আপনি চলে আসবেন। আর বড় হলে আপনার নাতি নিজেও গিয়ে আপনাদের বাড়িতে ঘুরে আসবে।
- তুমি কি সত্যিই আর কোনদিন যাবে না?
- না আম্মা।
- আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে আমি এখন যাই। বাড়িতে গিয়ে আবার রান্না করতে হবে।
২৯-০৭-১৯৯৭
আজ আবার আমার শাশুড়ী এসেছিলেন। আবার সেই পুরনো আবদার করেছেন কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারি নাই।
- আমি বললাম, মা আজকে কিন্তু দুপুরে খেয়ে তারপর যাবেন।
- না রে মা, বাবুলের কদিন ধরে খুব জ্বর। [ বাবুল আমার স্বামীর নাম ]
- ডাক্তার দেখাননি?
- হ্যাঁ দেখিয়েছি, কাজ হচ্ছে না। শহরে গিয়ে ভালো ডাক্তার দেখানো দরকার কিন্তু বাবুল তো রাজি হয় না।
- ওহ্।
- আমি তাহলে আসি, তোমার শশুর আজকে আসতে চেয়েছিল কিন্তু আমি সঙ্গে আনিনি।
- আম্মা আমি ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
- একটা কথা বলি বউমা?
- জ্বি বলেন।
- বাবুলের বড় চাচির স্বভাব তোমার অজানা নয়। আমার বাবুল এর আগে বিয়ে করেছিল এরকম মিথ্যা বানোয়াট গল্প সে তোমার কাছে বলেছে। তোমার উচিৎ ছিল আমার সঙ্গে সবকিছু নিয়ে ভালো করে কথা বলা।
যারা আমাদের ক্ষতি চায় তাদের কথার উপর ভিত্তি করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি। তুমি বাবুলের সঙ্গে এটা নিয়ে ঝগড়া না করে সরাসরি আমার সঙ্গে কথা বলতে পারতে। বাবুল এমনিতেই একটু রাগী স্বভাবের, তাই এমন উল্টাপাল্টা কথা শুনে সে হয়তো রেগে গেছে। যাইহোক, ভালো থেকো।
৩০-০৯-১৯৯৭।
দুমাস ধরে আর কেউ এলো না। আমাদের বাড়ি থেকে শশুর বাড়ির দুরত্ব মোটামুটি ৮/১০ কিলোমিটার। খবর নেবার কোনো উপায় ছিল না। আমি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অপেক্ষা করেছিলাম।
দুমাস পড়ে আমার শাশুড়ী এলেন। আমি বেশ খুশি মনে তার সামনে গিয়ে বসলাম।
- কেমন আছেন আম্মা?
- এইতো আলহামদুলিল্লাহ। তোমরা কেমন আছো? আমার দাদুভাই কেমন আছে?
- সবাই ভালো আছে আম্মা। আপনি এবার এতো দেরি করে এলেন যে? আমি অনেক অপেক্ষা করছি আপনি আসবেন তারপর আপনার সঙ্গে যাবো।
- আসলে বাবুল মারা যাবার পর তোমার শশুর আর আমি দুজনেই বেশ ভেঙে পড়ি। তাই এতদিন ধরে আসতে পারিনি, তাছাড়া তোমার শশুর নিজেও একটু রেগে আছে। কিন্তু নাতিটাকে দেখার জন্য আসতে বাধ্য হলাম, বাবুল মৃত্যুর আগে বলেছিল ওর সন্তানের খোঁজ খবর রাখতে।
আম্মার কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
- উনি কবে মারা গেছে আম্মা?
- আমি সেবার তোমাদের বাসা থেকে যাবার সপ্তাহ খানিক পড়ে মারা গেছে।
- আমি মাথা নিচু করে রইলাম। কিছু বলতে গিয়ে গলা আটকে এলো।
- নিজেদের মধ্যে কখনো বাহিরের মানুষের কথা শুনে সম্পর্ক বিচ্ছেদ করা উচিৎ না। দিনশেষে নিজেদেরই ক্ষতি হবে, আর সেই বহিরাগত মানুষের কোনো লাভ লোকসান হবে না। তোমার বিপদের দিনে তারা কেউ এগিয়ে আসবে না। তোমার কাছে খবর পাঠাতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোমার বাবুল নিষেধ করে গেছিল।
|
|
অনেক পুরনো বইপুস্তকের মধ্যে যে ছোট্ট নোটবুকটা পেয়েছি সেখানে এই তিনটা তারিখের ঘটনা উল্লেখ করা ছিল। ১৯৯৭ সালের ঘটনা তাই হয়তো এখনকার মতো মোবাইলের সুব্যবস্থা তখন ছিল না। চাইলেই মিনিটের মধ্যে যেকোনো স্থানে খবর দেওয়া যেত না হয়তো। তবুও কিছু কিন্তু থেকে যায়।
খুব জানতে ইচ্ছে করছে পরবর্তীতে কি হয়েছিল বাবুল এর স্ত্রী সন্তানের। কিন্তু উপায় নেই।
সমাপ্ত।
গল্পঃ-
সিদ্ধান্তের ভুল।
মোঃ আবীদ আবরার।
Comments
Post a Comment